স্ত্রীর পত্র
আমি তোমাদের মেজবউ। আজ পনেরো বছরের পরে এই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি, আমার জগত এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য সম্বন্ধও আছে। তাই আজ সাহস করে এই চিঠিখানি লিখছি — এ তোমাদের মেজবউয়ের চিঠি নয়।
আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে, আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখিনি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি — মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি, চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায়নি।
আমাদের বড়ো জায়ের বাপের বংশে কুল ছাড়া আর বড়ো কিছু ছিল না — রূপও না, টাকাও না। আমার শ্বশুরের হাতে-পায়ে ধরে কেমন করে তোমাদের ঘরে তাঁর বিবাহ হলো সে তো সমস্তই জানো। তিনি নিজের বিবাহটাকে এ বংশের প্রতি বিষম একটা অপরাধ বলেই চিরকাল মনে জেনেছেন। সেইজন্যে সকল বিষয়েই নিজেকে যতদূর সম্ভব সংকুচিত করে তোমাদের ঘরে তিনি অতি অল্প জায়গা জুড়ে থাকেন।
আমার জা-জায়েরা, ননদ-ননদিরা, শ্বশুরমশায় — এ-সকল মানুষকে দেখেই আমার বিয়ে হয়েছে। বাপের বাড়ির সঙ্গে আমার শ্বশুরের বাড়ির কোনো তুলনাই হতে পারে না। বাপের বাড়িতে কখনো কোনো কারণে আমাকে সংকোচ বোধ করতে হয়নি। আমি ছোটোবেলায় অনেক শিখেছি — গানও জানতুম, কবিতা পড়তুম; আমার বাপের বাড়িতে ওগুলোতে কেউ আমার বৌ হয়ে যাওয়ার পরে বাধা দেবে এমন ধারণা আমার ছিল না।
কিন্তু তোমাদের ঘরে এসেই প্রথম দিন বুঝেছিলুম, আমি সেখানে আমার নিজের কোনো অধিকারের দাবী করতে পারব না। আমি তখন তরুণী — আমার রূপও ছিল, মনও ছিল, গলাও কিছু কম ছিল না। প্রথম প্রথম আমার উপর তোমাদের সংসারের স্নেহ-শাসন-অবজ্ঞা — সব একসঙ্গে এসে পড়েছিল। আমিও ভেবেছিলুম, এটাই বোধহয় স্বাভাবিক। বাপের বাড়ির সকল স্বাধীনতা ভুলে গিয়ে তোমাদের ঘরের নিয়মে নিজেকে ঢেলে দেবার চেষ্টা করেছিলুম।
কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলুম, সে সংসারে আমার কোনো স্থান নেই। আমার স্বামী, তুমি আমাকে কোনোদিন সঙ্গিনী বলে মানোনি। তোমার কাছে আমি ছিলুম শুধু ঘরের একটি সামগ্রী — রান্নাঘরের ধোঁয়া, চাকর-বাকরের তদারক, শ্বশুরবাড়ির ছোটো-বড়োদের খুশি করা — এই ছিল আমার কাজ। আমার মন, আমার বুদ্ধি, আমার কল্পনা — এ-সব যেন তোমরা মানুষ বলেই মানতে না। আমার গান তোমাদের কাছে ছিল অনুচিত, আমার বই পড়া ছিল ব্যর্থতা, আমার হাসি ছিল দৃষ্টিকটু, আমার নীরবতা ছিল অহংকার।
এরই মধ্যে আমার জীবনে এল ভাস্বতী।
ছোটো মেয়ে, দুঃখী, অসহায় — তবু ভীষণ বুদ্ধিমতী। তাকে আমি নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিলুম। সে-ও আমাকে ভালোবাসত। কিন্তু তোমাদের সংসারে তার করুণা পাওয়ারও অধিকার ছিল না। তার দুঃখ, তার দীনতা, তার সামান্য ভুল—সবই তোমরা ক্ষমা করতে পারোনি।
আমি দেখলুম তাকে তোমরা কেবল দাসীর মতো ব্যবহার করলে। তোমাদের ঘরের মানুষ সে ছিল না। তোমাদের পরিবার-সংস্কার ভাস্বতীর দিকে এক পলক তাকায়নি।
শেষপর্যন্ত সে অসহায় মেয়েটির মৃত্যু… সেই দিন আমি স্থির করলুম — এই সংসার আমার নয়।
আজ সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করছি — আমার বুকের মধ্যে একটি স্বাধীন প্রাণ আছে। যার কোনো বংশপরিচয় নেই, কোনো বাধা নেই, কোনো শিকল নেই। যে প্রাণ আজ মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে।
এত দিন তোমাদের ঘরে আমি যে ছিলুম — সে ছিল কেবল আমার দেহ। আজ আমি চলে যাচ্ছি — সে আমার মন।
আমি কারো শত্রু হয়ে যাচ্ছি না। কিন্তু আমি নিজের জীবনটুকুকে বাঁচাতে চাই। এ আমার অপরাধ হলে আমি সেই অপরাধ নিয়েই বাঁচব।
আমি কোথায় যাচ্ছি, তা আজই বলব না। তুমি চাইলে খোঁজ পাবে।
কিন্তু ফিরব না।
এবার সত্যি সত্যি —
তোমাদের মেজবউ নয় —
মৃণাল।
১) বোধপরীক্ষণ ভিত্তিক MCQ
1. গল্পের শুরুতে মৃণাল কোথায় দাঁড়িয়ে নিজের নতুন অনুভূতি উপলব্ধি করে?
A) নদীর ধারে
B) বাগানে
C) সমুদ্রের ধারে
D) ছাদে
2. মৃণাল কেন প্রথমে কোনোদিন স্বামীকে চিঠি লেখেনি?
A) লেখাপড়া জানত না
B) সুযোগ বা ফাঁক পেত না
C) স্বামী নিষেধ করেছিল
D) তার ইচ্ছে ছিল না
3. বাপের বাড়িতে মৃণালের কোন জিনিসগুলো বাধা পেত না, কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে বাধা পেত?
A) রান্না
B) গান এবং কবিতা পড়া
C) সেলাই
D) খাওয়া-দাওয়া
4. মৃণাল ভাস্বতীকে কেমনভাবে গ্রহণ করেছিল?
A) দাসীর মতো
B) বিরক্তির চোখে
C) নিজের সন্তানের মতো
D) উদাসীনভাবে
5. মৃণাল কেন শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়?
A) অর্থের অভাব
B) স্বামীর অসুখ
C) ভাস্বতীর প্রতি অবিচার ও নিজের স্বাধীনতার দমবন্ধ অনুভূতি
D) অন্য শহরে চাকরি পায়
২) ব্যাকরণ ভিত্তিক MCQ
6. “আজ পনেরো বছরের পরে এই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি”— এখানে “দাঁড়িয়ে” কোন পদ?
A) ক্রিয়াবিশেষণ
B) সমাস
C) ক্রিয়ার অক্রিয় রূপ
D) অব্যয়
7. “আমার জগত এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য সম্বন্ধও আছে”— এখানে “সঙ্গে” কোন পদ?
A) অব্যয়
B) বিশেষণ
C) সর্বনাম
D) বিশেষ্য
8. “আমি চলে যাচ্ছি”— এখানে “যাচ্ছি” কোন কাল নির্দেশ করে?
A) অতীত কাল
B) ভবিষ্যৎ কাল
C) বর্তমান কাল
D) অনির্দিষ্ট কাল
9. “তোমাদের মেজবউ”— পদবন্ধটি কোন ধরনের?
A) বিশেষ্য + ক্রিয়া
B) সর্বনাম + বিশেষ্য
C) বিশেষণ + বিশেষ্য
D) সমাস
৩) চরিত্রগত বিশ্লেষণ MCQ
10. মৃণালের প্রকৃত মানসিক অবস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট পরিচয় কোনটি?
A) স্বামীভক্তি
B) বিদ্রোহী স্বাধীনচেতা মন
C) ভীরু স্বভাব
D) অলসতা
11. মৃণালের স্বামী কেমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে?
A) চিন্তাশীল ও সহানুভূতিশীল
B) মমতাময়
C) কর্তৃত্বপরায়ণ ও অবহেলাকারী
D) রোমান্টিক
12. ভাস্বতীর চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল গুণ কোনটি?
A) অহংকার
B) বুদ্ধিমত্তা ও স্নেহপিপাসু স্বভাব
C) রাগ
D) অলসতা
৪) প্রয়োগমূলক প্রশ্ন (Applied MCQ)
13. যদি আপনি মৃণালের স্থানে থাকতেন, গল্পের পরিস্থিতিতে প্রথমে কী করতেন?
A) কোনোরকম প্রতিবাদ করতেন না
B) নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার চেষ্টা করতেন
C) কাউকে দোষ দিতেন না এবং নীরব থাকতেন
D) সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে যেতেন
14. গল্পটি সমাজকে কোন মূল বার্তা দেয়?
A) কেবল দুঃখের গল্প
B) নারীর স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার দাবি
C) পারিবারিক অর্থনীতি
D) বিদ্বেষ সৃষ্টি করা
15. ভাস্বতীর প্রতি অবিচার যদি না হতো, তবে মৃণালের সিদ্ধান্ত কী হতে পারত?
A) হয়তো সে সংসারেই থাকত
B) আরও বড় ঝগড়া বাঁধত
C) সে বিদেশ চলে যেত
D) সে চিঠি লিখত না
উত্তর তালিকা
1-C
2-B
3-B
4-C
5-C
6-C
7-A
8-C
9-B
10-B
11-C
12-B
13-B
14-B
15-A
.gif)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন